আজকাল শীত বড় দেয়ালা করে। এই সে উত্তুরে হাওয়ায় ভর দিয়ে একটু উঁকি দিল আর অমনি সাত-সাগরের ওপার থেকে চোখ রাঙালো পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। ব্যাস্, শীতও অমনি ভয়ে জুজুবুড়ি। আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু শীতের এমন নেকুপুষু হাব-ভাব ছিল না মোটেই। সে আসত বীরদর্পে, সোনালি রোদের বর্ম পরে।তখন আমি থাকতাম আসানসোলে। সেখানে শীতের দাপটই অন্যরকম।সদর্পে এবং সদম্ভে শীতের আগমনবার্তা ঘোষিত হলেই ভয়ে মনের ভিতরটা কুঁকড়ে যেত। কারণ শীত মানেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা, সারা বছরের পড়ার হিসেব-নিকেশ। তবে পরীক্ষাটা একবার কোনোরকমে সেরে ফেলতে পারলেই বড়দিনের লম্বা ছুটি। আর শীতের এই ছুটিটার অন্যতম আকর্ষণ ছিল চড়ুইভাতি।
ব্লগ
অবশেষ বঙ্গে শীত এসেছে। বাজারে সবজির রঙিন সমারোহ দেখে মনে পড়ল এই বিশেষ পদটি শীতকালেই বানাতেন আমার মা। ছোটবেলায় আমরা যেখানে থাকতাম সেই রাঢ়বঙ্গে শীতের সবজি উঠতে শুরু করত মোটামুটি পুজোর পর থেকেই। সেই সময় রাঁচির ওদিক থেকে আসত বড় বড় ধপধপে সাদা ফুলকফি, নরম কচি বীনস্, লম্বাটে মুক্তকেশী বেগুন, টুকটুকে লাল গাজর আর খানিকটা কমলাটে রঙের চ্যাপ্টা মত টোম্যাটো। এখন যেমন নিটোল লাল, পানসে স্বাদের হাইব্রিড টোম্যাটো বাজারে ওঠে, তখন সেরকমটা পাওয়া যেত না মোটেই। তবে সেই বোঁটাসুদ্ধ সবজিটির স্বাদ-গন্ধ দুই-ই ছিল চমৎকার। এবার শীত পড়ার শুরু থেকেই এসব তো খাওয়া হচ্ছে। তাই একটা সময় যখন একটু একঘেয়ে লাগতে শুরু করল তখন মা বানাতেন এই আচারি চচ্চড়ি।
রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সঙ্গে আমার পরিচয় কিংবা বলা ভালো প্রথম দেখা হয়েছিল যখন, তখন আমি নেহাতই ছোট। স্কুলে পড়ি। তাও খুব উঁচু ক্লাসে নয়। অজিতেশ বাবার বন্ধু ছিলেন। সেই সুবাদে কোনও একটা নাটকের শেষে গ্রিনরুমে বসে বাবা এবং অজিত জেঠুর অন্য বন্ধুরা যখন গল্প করছেন, তখনই দেখেছিলাম রুদ্রপ্রসাদকেও। খুব যে নজর করেছিলাম তেমনটা নয়। তারপর নান্দীকার ভেঙে গেল। অজিতেশ আলাদা দল করলেন। অজিতেশ এবং রুদ্রপ্রসাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হল। কিন্তু বাবা আদতে অজিতেশের বন্ধু হলেও রুদ্রবাবুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।
মাছের টক ব্যাপারটা একেবারেই ঘটিদের নিজস্ব। ওপার বাংলা নদী-নালার দেশ। সেখানে মাছের আধিক্য চিরকালই বেশি। মাছের রকমারি রান্নায় তাদের দক্ষতাও সর্বজনবিদিত। এক ইলিশেরই কত রকম পদ। তাছাড়া রকমারি চুনোমাছের যেমন বাহারি নাম তেমনি তাদের রান্নারও বাহার। যে কোনও রান্নাতেই একমুঠো কুচো চিংড়ি ছড়িয়ে দিয়ে স্বাদ আনতে তারা ওস্তাদ। তবে মাছ দিয়ে টক রান্নার চল কিন্তু তেমনভাবে নেই। এরকম তো হতে পারে না যে ওপার তেঁতুল, আমড়া কিংবা বাঁদর ভ্যাবাচাকা আমগাছের সংখ্যা কম ছিল। তবু মাছের সঙ্গে এসবের রসায়ন পদ্মাপারের লোকেরা ঠিক মানতে চান না।
আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে সিনেমাটা দেখেছিলাম, তার নাম উমরাওজান। গ্লোব সিনেমা হলে। সেই ছবিটা দেখা আমার কাছে প্রায় একটা অ্যাডভেঞ্চার বলা যেতে পারে। উমরাওজান মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮১ সালে। যদিও আমি ছবিটা দেখেছি তার বেশ কয়েকবছর পরে। কোনও কারণে বোধহয় আবার হলে দেখানো হয়েছিল। তবে তখন মফঃস্বলের মেয়ে হলেও রেখাকে আমি চিনতাম। তার আগে অমিতাভ বচ্চন এবং রেখা অভিনীত গোটা দুয়েক ছবি দেখা হয়ে গেছে। তাই রেখার জন্যই ছবিটা দেখতে গেছিলাম।
আগের পর্বে লিখেছিলাম স্কুলে পড়ার সময় বৃষ্টিতে মনের সুখে ভেজার গল্প। কথা দিয়েছিলাম এর পরের বৃষ্টিস্নানের গল্পটি হবে রোম্যান্টিক। সেই কথাই বলি এবার। তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হোস্টেলে থাকি। ইতিমধ্যেই মনে দিব্যি রং লেগেছে। তখন যিনি প্রেমিক, বর্তমানে স্বামী তার সঙ্গে সকাল-বিকেল দেখা না হলে মন উচাটন। গল্প করতে বসলে সময় কোথা দিয়ে কেটে যায় টেরও পাওয়া যায় না।
সেদিন ছিল বছর শেষের চৈত্রমাস। অফিস ফেরতা নবনীতা দেবসেনের ভালো-বাসা বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলাম। ওরকম প্রায়ই যেতাম। একে তো পাঁচবছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তুলনামূলক সহিত্য পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যাওয়ার পরও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। মহিলা লেখকদের নিয়ে নবনীতাদি সই নাম দিয়ে একটি মঞ্চ করেছিলেন। আমি তখন তার সক্রিয় সদস্য। ফলে কাজকর্মও থাকত নানারকম। প্রায়দিনই দুপুরবেলায় ফোন যেত, ‘অফিস ফেরতা একবার আমার এখানে ঘুরে যাস।‘ আমিও দিব্যি খুশি হয়ে নাচতে নাচতে যেতাম।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করার কারণে বিভিন্ন জগতের সেলিব্রিটিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। তাঁদের আচার-আচরণ, মানসিকতা সম্পর্কে একটা ধারণাও তৈরি হয়েছে। যেমন একটা কথা বলাই যায় এই সব ধরনের সেলিব্রিটিরাই নিজেদের ইমেজ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। ঠিক কতটুকু বলা দরকার, তার বেশি বলা কিংবা হাসা হয়ে গেল কিনা সেবিষয়ে সতর্ক থাকেন। কোন দরের মানুষের সঙ্গে কেমনভাবে কথা বলবেন, সেটাও দিব্যি নির্দিষ্ট করা থাকে।
এবার বর্ষা বেশ ঘনঘোর করে নেমেছে। ঘুম ভাঙছে মেঘের গুরুগুরু আওয়াজে। তারপর সারাদিন ঝমঝম কিংবা ঝুপঝুপ কিংবা ঝিমঝিম। গাছাপালা সব নেয়ে-ধুয়ে ফিটফাট। কাদা মাটিতে ফনফনিয়ে বাড়ছে আগাছার জঙ্গল। এসব কারণে অনেকেরই বর্ষা ভারি অপছন্দ। তারা মনে করে, আকাশের মেঘগুলোকে কাঁচি দিয়ে কেটে গ্রামে-গঞ্জে ছেড়ে দিয়ে আসতে পারলে ভালো হয়। সেখানে যতখুশি জল ঝরুক। শহর যেন শুকনো খটখটে-ফিটফাট থাকে। প্রকৃতি অবশ্য এমন মামাবাড়ির আবদারে কান দেন না মোটেই। তাই তিলোত্তমাতেও বৃষ্টি নামে অঝোরধারে।
এখন যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে যে তোমার সবথেকে প্রিয় খাবার কী, তাহলে যে উত্তরটা দেব, সেটা শুনলে অনেকেই অবাক হয়ে যাবেন। কেউ কেউ হয়তো বুঝতেও পারবেন না কারণ নামটা অচেনা। আর বেশিরভাগ মানুষ হেসেও ফেলতে পারেন। কিন্তু কিছু করার নেই। নিজের ব্লগে তো আমাকে সত্যি কথা বলতেই হবে। তাছাড়া সৃষ্টিছাড়া টেস্টি নামেই মালুম দেয় যে এখানে আমি একটু অন্যরকম অপরিচিত খাবারের কথাই লিখব। তাই কথাটা এখানেই সবার সামনে দিল খুলে বলে দেব ঠিক করেছি।
জয় গোস্বামীর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। আমি যে তখন খুব কবিতা পড়তাম, কিংবা এখনও পড়ি, তেমনটা নয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র ছিলেন শ্যামল ভট্টাচার্য। শ্যামলদা নিজে খুব ভালো কবিতা লিখতেন। শ্যামলদাই আমাকে প্রথম জয় গোস্বামীর কবিতা শুনিয়েছিলেন। তারপর ১৯৯৬ নাগাদ জয় গোস্বামীর মালতীবালা বালিক বিদ্যালয়ে সুর দিয়ে বেণীমাধব গাইলেন লোপামুদ্রা।
আমার ছোটবেলা কেটেছে রাঢবঙ্গে। সেখানে গ্রীষ্মকাল মানে একটা বেশ ভয়াবহ ব্যাপার। পয়লা বৈশাখের নাচ-গান-নাটক যখন হচ্ছে তখনও পর্যন্ত আবহাওয়া মোটামুটি সহনীয়। কিন্তু এপ্রিলের শেষ থেকেই আকাশ একটা বেশ জ্বলন্ত কড়াইয়ের রূপ ধারণ করে সকাল হতে না হতে আগুন ঢালতে শুরু করে দিত ।সেসব দিনে মোটামুটি আলো ফুটতে না ফুটতে দিন শুরু হয়ে যেত। সবাই চেষ্টা করত ভোর ভোর বাইরের কাজ সেরে নিতে। বেলা একটু বাড়লেই রাস্তাঘাট ফাঁকা।
আমার মামারবাড়ি ছিল ধানবাদে। ছিল বলি কেন, এখনও আছে। মামা থাকেন ধানবাদেই। তবে আগে যেমন মামা-মাসি-দিদিমা-বড়মামা এরকম নানা আত্মীয়স্বজন মিলে একটা বেশ জমজমাট ব্যাপার ছিল এখন আর জীবনের স্বাভাবিক নিয়মেই তা নেই। যেসময়ের কথা বলছি, তখন আমি বেশ ছোট। সম্ভবত ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ি। দাদু আমার মায়ের বিয়ের আগেই চলে গেছিলেন। জ্ঞানত আমি প্রথম যেটাকে মামাবাড়ি বলে চিনেছি সেটা ছিল আমার বড়মামা মানে মায়ের জাঠতুতো দাদার কোয়ার্টার।
প্রথম আলাপের দ্বিতীয় পর্বে এমন একজনের কথা বলব, যিনি আমাদের দেশের মানুষ নন। প্রতিবেশী বাংলাদেশের নাগরিক। অসুস্থতার কারণে গত কয়েক বছর যাবৎ তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের কাছে থাকতে হচ্ছে, কিন্তু তাঁর কর্মজীবন পুরোটাই কেটেছে বাংলাদেশে। যদিও তাঁর বেড়ে ওঠা এই বঙ্গে, পশ্চিমবাংলার বর্ধমান জেলায়। অজিতেশের মতোই তিনিও আমার পিতৃবন্ধু, সহপাঠী, তাঁর নাম সৈয়দ হাসান ইমাম।
পেশায় সাংবাদিক। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগ প্রায় তিরিশ বছরের। কাজের সূত্রেই বহু বিশিষ্ট মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সেই আলাপ কখনও পরবর্তীকালে ঘনিষ্ঠতায় গড়িয়েছে। আমি তাঁর কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি। কখনও আবার প্রথম আলাপেই পরিচয়পর্ব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার নিজের কাছে এই প্রতিটি পরিচয়েরই আলাদা মূল্য আছে।
নামটা বেশ অদ্ভুত তাই না ? আসলে কিছু ছিষ্টিছাড়া খাবারের কথাই তো লিখব। এবার সেটা টেস্টি কিনা সে তো যিনি খাবেন তিনি বুঝবেন। কারণ খানা তো সবসময়ই আপরুচি। আমার টেস্টি লাগে। তার পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। জিভের স্বাদকোরকের সঙ্গে মিলে-মিশে যেতে পারে স্মৃতির রং, মনখারাপের মেদুরতা।
বছর শুরু গ্রীষ্মে। তাই তাকে দিয়ে শুরু করাই ভালো। যদিও গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কল্যাণে ইদানীং গ্রীষ্মের বোলবোলাও বড্ড বেড়েছে। ফাল্গুন মাস শেষ হতে না হতে সূর্যদেব যেন কেমনধারা কটমট করে তাকাতে শুরু করেন। দখিনা বাতাসে যেন বারুদের গন্ধ। তারওপর আজকাল একটা নতুন শব্দও চালু হয়েছে খুব , তাপপ্রবাহ। আবহাওয়া অফিসের পণ্ডিতরা যেন টিকি নেড়ে বসে আছেন।