আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে সিনেমাটা দেখেছিলাম, তার নাম উমরাওজান। গ্লোব সিনেমা হলে। সেই ছবিটা দেখা আমার কাছে প্রায় একটা অ্যাডভেঞ্চার বলা যেতে পারে। উমরাওজান মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮১ সালে। যদিও আমি ছবিটা দেখেছি তার বেশ কয়েকবছর পরে। কোনও কারণে বোধহয় আবার হলে দেখানো হয়েছিল। তবে তখন মফঃস্বলের মেয়ে হলেও রেখাকে আমি চিনতাম। তার আগে অমিতাভ বচ্চন এবং রেখা অভিনীত গোটা দুয়েক ছবি দেখা হয়ে গেছে। তাই রেখার জন্যই ছবিটা দেখতে গেছিলাম। কিন্তু তখন আমি সবে কলকাতায় এসেছি। রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না। হোস্টেল পাইনি। থাকি ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের কাছে এক দিদির বাড়িতে। বন্ধুরা সিনেমা যাবে শুনে অতি উৎসাহে রাজি তো হয়ে গেছি। কিন্তু বাড়ি কী করে ফিরব জানি না, কারণ সিনেমা দেখে অন্যরা তো সব নিজের নিজের বাড়ি চলে যাবে। এদিকে আনাড়ি আমি তো ওই ত্রিকোণ পার্ক থেকে যাদবপুর আসার পথটুকু ছাড়া আর কিছুই চিনি না। যাই হোক্, শেষপর্যন্ত দলে একজনকে পাওয়া গেল, যার বাড়ি যাদবপুরে। ঠিক হল তার সঙ্গে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত চলে আসব। তারপর ফেরার রাস্তা তো জানা। তখন মেট্রো রেলের কল্যাণে আশুতোষ মুখার্জি রোড বন্ধ। পাঁচ নম্বর বাস আসতো ল্যান্সডাউন হয়ে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে। আমি সেদিন বাসে চেপে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের ওপর দিয়েই যাদবপুর এসেছিলাম আবার ফিরে গেছিলাম। আনাড়ির মরণ আর কাকে বলে। যাই হোক্, ধান ভানতে অনেকক্ষণ শিবের গীত হল। এবার আসল কথায় আসি। সিনেমাটা অসম্ভব ভালো লেগেছিল। রেখা তো তাঁর মতো করেই অনবদ্য। কিন্তু আরও একজনের অভিনয় দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি হলেন নাসিরুদ্দিন শাহ। ওটাই আমার দেখা নাসিরুদ্দিনের প্রথম ছবি। তার আগে আমি নাসিরকে চিনতাম না। নামও শুনিনি। এমনিতেই বারো ক্লাস পর্যন্ত হিন্দি সিনেমা দেখার সুযোগ ছিল খুব কম। তাছাড়া আসানসোলের মত জায়গায় আলাদাভাবে তথাকথিত আর্ট ফিল্ম বা আলাদারকম ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ প্রায় ছিলই না। তবে বন্ধুদের বেশিরভাগই তো কলকাতার। তাদের নানারমক ছবি দেখার কিংবা জানার সুযোগ ছিল। সেরকমই কেউ একজন বোধহয় নামটা বলেছিল। এর বেশ কিছুদিন পরে দেখলাম অ্যালবার্ট পিন্টো কা গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়। এটা বেশ সচেতনভাবে দেখা ছবি। কারণ ততদিনে আমার চিন্তা-ভাবনায় যাদবপুরের হাওয়া লাগা শুরু হয়েছে। আমার তখনকার বয়ফ্রেন্ড, এখন যিনি বর, তার সঙ্গেই দেখতে গেছিলাম ছবিটা। আমার নাসিরুদ্দিন সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানও তার কাছ থেকেই পাওয়া। অ্যালবার্ট পিন্টোও তখন বেশ পুরোনো ছবি। সম্ভবত কোনও একটা ফেস্টিভ্যাল হচ্ছিল, সেখানেই দেখেছিলাম। নাসিরুদ্দিন আমাকে প্রায় অভিভূত করে ফেলেন পার ছবিতে। পরিচালক গৌতম ঘোষ। শুয়োর খেদানো ডোমের ভূমিকায় নাসিরকে দেখে আমি বোধহয় বিস্মিত হতেও ভুলে গেছিলাম। অভিনয়ের প্রয়োজনে মানুষ যে এভাবে নিজেকে ভাঙতে পারে, পুরোপুরি ডিক্লাসইফাই করে ফেলতে পারে, সেটা ওই ছবিতে নাসির এবং অবশ্যই শাবানারও অভিনয় না দেখলে বুঝতে পারতাম না। ক্রমশ অভ্যাসটা এরকম দাঁড়াল, নাসিরুদ্দিনের নতুন ছবি মিস্ করতাম না। নিশান্ত, মন্থন, জুনুন, মির্চ মশালা, মাসুম, মান্ডি, কথা একের পর এক দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। ২০১০ সাল নাগাদ সুযোগ হয়েছিল নাসিরুদ্দিনের একটি নাটক দেখারও। কলামন্দিরে শো। তবে টিকিটের দাম এত বেশি ছিল যে সামনের দিকে বসার সুযোগ পাইনি। তাই খুব যে উপভোগ করেছিলাম তেমনটা বলব না। সেটা ছিল সম্ভবত ২০১৪ সাল। টেলিভিশন চ্যানেলে চাকরি করি। অফিসে সেলিব্রিটি লোকজনদের আনাগোনা থাকেই। অনেকবছর ধরে সাংবাদিকতা করার সুবাদে সেলিব্রিটি মোহ ততদিনে ঘুচে গেছে। তাই কে আসছেন, কেন আসছেন তা নিয়ে মাথা ঘামাইনা। কিন্তু সেদিন যখন দুপুরে ক্যান্টিনে খেতে গিয়ে শুনলাম নাসিরুদ্দিশ শাহ আসবেন, তাঁর সঙ্গে একটা এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা হয়েছে, তখন ঠিক করে ফেলেছিলাম কথা বলতেই হবে। খাওয়া সেরে নিয়ে তাই বসে থাকলাম খাপ পেতে। সেসময় আমাদের বালিগঞ্জের অফিসে ক্যান্টিনের পাশেই ছিল স্টুডিও। তাই যেতে তো হবেই ওখান দিয়ে। আর তখনই ধরব। একটু পরেই এলেন নাসির। ততদিনে চুল প্রায় সবই সাদা। মুখেও হালকা ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু ঋজু, টানটান চেহারা। আমার সৌভাগ্য, জানা গেল যিনি ইন্টারভিউ নেবেন সেই এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর একটা খুব জরুরি কাজে আটকে গেছেন। আসতে মিনিট দশেক দেরি হবে।

নো প্রবলেম, আই ক্যান ওয়েট.....

হাসিমুখে কথাটা বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি প্রায় লাফিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম,

আমি আপনার একদম ডাই হার্ট ফ্যান। প্রায় সব ছবিই দেখেছি। যেটুকু সময় পাওয়া গেল, একটু কথা বলতে পারি ?

হ্যাঁ নিশ্চয়। ফ্যানদের আমি কখনও উপেক্ষা করি না। আসলে আমার ফ্যানের সংখ্যা খুব কম তো.....আর যত বয়স বাড়ছে আরও কমে যাচ্ছে.....বাট উইথ আ কাপ অফ কফি.....

বলেই মুচকি হাসলেন একটু। আমি ক্যান্টিনে কফি অর্ডার দিলাম আর নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখলাম, সত্যিই আমি নাসিরুদ্দিনের সামনে বসে আছি তো। সব মিলিয়ে মিনিট কুড়ি গল্প করেছিলাম আমরা। গল্প করেছিলাম বলাটা ভুল হল। কথা উনি বলছিলেন, আমি শুধু মুগ্ধ শ্রোতা। মাঝে মাঝে দু-একটা আলগা সুতোর মতো প্রশ্ন করছিলাম। সবকথা এখানে বলার সুযোগ হবে না। যে দু-একটি বিষয়ে তাঁর মন্তব্য শুনে রীতিমত অভিভূত হয়ে গেছিলাম সেটাই বলি। বলিউডের ব্যস্ত অভিনেতা। শুধু তো আর্ট ফিল্ম নয়, বহু বাণিজ্যিক ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। এরপরেও নাটক করেন নিয়মিত। কী করে সম্ভব পারেন ? প্রশ্নের উত্তরে নাসির বললেন,

না করে কোনও উপায় নেই, বাঁচতে হবে তো। শুধুমাত্র পেটে খেয়ে যে বেঁচে থাকা, সেটাকেই যদি সব না ধরি, তাহলে তো আমায় বেঁচে থাকতে হলে নাটক করতেই হবে। নাটক না করে আমার কোনও উপায় নেই। হ্যাঁ, ঠিক একইভাবে আমাকে সিনেমাটাও করতে হবে। সিনেমা না করলে আমার ভরপেট ভাত জোটাটা নিশ্চিত করতে পারব না কারণ ওটা ছাড়া আর কোনও কাজ আমি জানি না। আর কিছু আমি শিখিনি। অভিনয় করতে পারাটাই আমার একমাত্র স্কিল। তাই সেটার সাহায্যে আমাকে পেটের ক্ষিদে মেটাতে হয়, আর মনের ক্ষিদের জন্য, বলতে পারেন বাকি পুরো বেঁচে থাকাটার জন্যই নাটক করি।

দুটো যদিও আলাদা মাধ্যম কিন্তু আদতে তো দুটোই অভিনয়। নিজেকে ভেঙে বেরিয়ে অন্য একটা চরিত্রের মধ্যে ঢুকে পড়া। তাহলে দুটো অনুভূতির এত পার্থক্য হয় কেন ?

ঠিকই বলেছেন, দুটোই অভিনয়। কিন্তু এই দুই অভিনয়ের স্থানভেদ আছে। সেখানেই পার্থক্যটা তৈরি হয়। সিনেমায় আপনি অভিনয় করছেন স্টুডিওর ভিতরে। আউটডোর হলেও সেখানে সাধারণ মানুষ বড়জোর অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখছে। আপনার নিজের একটা স্পেস তৈরি হচ্ছে। সেখানে আপনি নিজেকে ভাঙচুর করছেন। কিন্তু স্টেজে তো আপনি সবার সামনে। দর্শকদের সঙ্গে চোখে-চোখ মিলিয়ে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতে হচ্ছে আপনাকে। সেখানে আপনার কোনও স্পেস নেই, আপনি একদম ন্যাংটো। আপনার প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালন সামনে বসে থাকা অতগুলো লোক মনিটর করছে। পালাবার কোনও জায়গা নেই। একমাত্র জায়গা হচ্ছে চরিত্রটার মধ্যে ঢুকে পড়া, নিজে ওই মানুষটা হয়ে যাওয়া। তখন আপনার আর দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগে কোনও সমস্যা নেই। তারা তো আর আপনাকে দেখছে না, অন্য লোকটাকে দেখছে। এই যে একদম অন্য একটা চরিত্র হয়ে গিয়ে অতগুলো মানুষকে বোকা বানিয়ে তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগস্থাপন, এটা একদম একটা ঐশ্বরিক অনুভূতি। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, কিন্তু তবু বলব যিনি পারেন, তিনি নিজেকে প্রায় ঈশ্বরের পর্যায়ে নিয়ে যান। আমি পারি না। চেষ্টা করি। আর এই চেষ্টার মধ্যে যে আনন্দ সেটাই আমাকে বাঁচতে সাহায্য করে। অভিনয় নয় এটা আসলে আমার সত্যিকারের বেঁচে থাকার লড়াই বলতে পারেন।

সিনেমা নিয়ে আরও কথা হয়েছিল। কীভাবে তিনি মোহরা কিংবা সরফরোশ-এ ওরকম অসম্ভব ভালো ভিলেনের অভিনয় করেছিলেন তাও জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সেসব কথা সময়-সুযোগ মত বলব। তবে একটা কথা এখানে স্বীকার করে নেওয়া ভালো। সাংবাদিকতার সূত্রে বহু বিশিষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তিরিশ বছরের সাংবাদিক জীবনে হাতে গোণা কয়েকজনকেই প্রণাম করেছি। কথা বলার পর, নাসিরুদ্দিন শাহকে সেদিন আমি প্রণাম করেছিলাম কিংবা বলা ভালো প্রণত হয়ে ধন্য হয়েছিলাম। বিব্রত হননি কিন্তু। মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন।