
আগের পর্বে লিখেছিলাম স্কুলে পড়ার সময় বৃষ্টিতে মনের সুখে ভেজার গল্প। কথা দিয়েছিলাম এর পরের বৃষ্টিস্নানের গল্পটি হবে রোম্যান্টিক। সেই কথাই বলি এবার। তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হোস্টেলে থাকি। ইতিমধ্যেই মনে দিব্যি রং লেগেছে। তখন যিনি প্রেমিক, বর্তমানে স্বামী তার সঙ্গে সকাল-বিকেল দেখা না হলে মন উচাটন। গল্প করতে বসলে সময় কোথা দিয়ে কেটে যায় টেরও পাওয়া যায় না। প্রেমপর্ব শুরু হয়েছিল এক শীতের সকালে। তারপর বসন্ত, গ্রীষ্ম পেরিয়ে যখন বর্ষা এল, ততদিনে প্রেম ঘন হলেও পরস্পরকে চেনা, ভালো লাগা-মন্দ লাগা বিষয়ে জানা তখনও বাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গরমের ছুটি থাকত দুমাস। তাই দীর্ঘ বিরহের পর যখন হোস্টেলে ফিরলাম, তখন বর্ষা সমাগত প্রায়। আকাশ সজল-কালো মে্ঘে ঢেকে যেতেই আমার মনেও খুশির সুবাতাস বইছে। কিন্তু আমার বন্ধু তো এই খুশির কারণ কিছুই বুঝছে না। দু-চারদিনের মধ্যেই মাথায় ঢুকলো আমার মতো মোটেই তার কোনও বর্ষা প্রেম নেই। বরং বৃষ্টি দেখলেই তার বিরক্ত লাগে। আজীবন কলকাতা এবং শরহতলিতে বড় হওয়ায় ছেলের কাছে বর্ষা আর রাস্তায় জমা নোংরা জল, কাদা, প্যাচপেচে ঘাম সব সমগোত্রীয়। এ তো ভালো বিপদ হল। এরকম হলে তো চলবে না। তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বড় বড় গাছে ভর্তি। আমার হোস্টেলের জানলা থেকেই দেখা যেত থোপা থোপা গাঢ় গোলাপি ফুলে ঢাকা একটা গাছ। ঝিরিঝিরি পাতা। ফুলের নাম আজও জানি না। তবে ফুল ফুটতো বর্ষায়। জলে ভেজা ফুলের শোভায় আমি মুগ্ধ হয়ে যেতাম। কলেজ যাওয়ার পথে ছিল এক মস্ত কদম। নিচে ছড়িয়ে থাকত হলুদ-সাদা কেশর। সুগন্ধ আসতো নাকে। কাঠের সেতু পার হলেই সাদা কুরচি ফুলে ঢাকা গাছটিও চমৎকার। চেষ্টা করলাম এসব দেখিয়ে মন ঘোরাবার। কিন্তু লাভ হল না কিছু। গাছ-ফুল এসবরে বদলে তার খালি চোখে পড়ে বর্ষায় বেড়ে ওঠা ঘাসজঙ্গল আর আগাছা। সাপের ভয়ে আতঙ্কিত হয়। কিন্তু আমি অকুতোভয়। তারপরেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গান তো গাইতে পারি না। কিন্তু রবিঠাকুরের বর্ষার কবিতা খুঁজে খুঁজে পড়ে শোনাচ্ছি। এরকমই চলছিল। কিন্তু একদিন ঘটে গেল এক মহা দুর্ঘটনা। ছুটির দিন ছিল। বিকেল বিকেল বেরিয়ে আমরা দুটিতে গেছিলাম রবীন্দ্রসরোবর লেকে। তখনই আকাশে বেশ মেঘ জমেছে। গল্প করতে মশগুল থাকায় প্রথমটা খেয়াল করেনি কিন্তু একটু পরেই তার চোখে পড়ল মেঘ বেশ ঘনঘোর করে এসেছে। ঠাণ্ডা-জোলো হাওয়া দিচ্ছে। অমনি শুরু হলে উঠে পড়ার জন্য তাড়া দেওয়া। এদিকে আমার ইচ্ছে লেকের জলে বৃষ্টির নাচ দেখার। তাই গড়িমসি করছি। কিন্তু ভবি ভোলার নয়। তাই ইচ্ছাপূরণের আগেই উঠতে হল। তবে ভাগ্য আমার সহায়। লেক থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে না উঠতেই প্রথমে টুপটাপ তারপর ঝমঝম বৃষ্টি। চিরকালই সার্দান অ্যাভিনিউ দিয়ে বাস প্রায় চলেই না। তাই বাসে উঠে আত্মরক্ষার কোনও উপায় নেই। সঙ্গে ছাতা নেই কারণ সেকালে ছাত্ররা ছাতাটাকে নেহাতই অপ্রয়োজনীয় জিনিস বলে মনে করতো। তবে কোনও বাড়ির সিঁড়ির নিচে বা দোকানে হয়তো আশ্রয় নেওয়া যেতো। কিন্তু আমি সেসবের ধারপাশ দিয়ে না গিয়ে মনের সুখে ঘুরে ঘুরে, নেচে নেচে (বেতালে) ভিজতে লাগলাম। সঙ্গে বেসুরো বর্ষার গান। এহেন কাণ্ড দেখে সঙ্গীর তো ততক্ষণে চোখ কপালে। এই পাগলকে আমি চিনি না বলে উল্টোদিকে হাঁটা দিতে পারতো, তবে দেয়নি। পাশে পাশেই ছিল এবং হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে সেও কণ্ঠ ছাড়ল মানে গান জুড়ে দিল। আপাদমস্তক ভিজে চুবড়ে একসময় গোলপার্কে এসে পৌঁছলাম। বৃষ্টি তখনও চলছে। নেহাৎ ছুটির দিন বলে কন্ডাক্টর বাসে উঠতে দিয়েছিল তবে বসতে দেয়নি, সিট ফাঁকা ছিল তাও। ইউনিভার্সিটি পৌঁছে দুজনেই সোজা নিজ নিজ হোস্টেলে। গরম জলে স্নান করে, জামা-কাপড় বদলে, চুল শুকিয়ে ঘণ্টাখানেক পরে আবার দেখা হল চা-এর দোকানে। তবে ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এতদিন এত চেষ্টাতেও যা পারিনি সেই বর্ষার প্রতি অনুরাগ অবশেষ অঙ্কুরিত হয়েছে। ক্রমশ কালে দিনে তা বৃক্ষে পরিণত হয়ে ফল-ফুলও দিয়েছে। কারণ আজকাল বর্ষায় শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা উঠলে আমার থেকে তারই উৎসাহ বেশি থাকে। দূর মাঠের ওপর দিয়ে বৃষ্টির ছুটে আসা দেখা তার ভারি পছন্দের।