আজকাল শীত বড় দেয়ালা করে। এই সে উত্তুরে হাওয়ায় ভর দিয়ে একটু উঁকি দিল আর অমনি সাত-সাগরের ওপার থেকে চোখ রাঙালো পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। ব্যাস্, শীতও অমনি ভয়ে জুজুবুড়ি। আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু শীতের এমন নেকুপুষু হাব-ভাব ছিল না মোটেই। সে আসত বীরদর্পে, সোনালি রোদের বর্ম পরে।তখন আমি থাকতাম আসানসোলে। সেখানে শীতের দাপটই অন্যরকম।সদর্পে এবং সদম্ভে শীতের আগমনবার্তা ঘোষিত হলেই ভয়ে মনের ভিতরটা কুঁকড়ে যেত। কারণ শীত মানেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা, সারা বছরের পড়ার হিসেব-নিকেশ। তবে পরীক্ষাটা একবার কোনোরকমে সেরে ফেলতে পারলেই বড়দিনের লম্বা ছুটি। আর শীতের এই ছুটিটার অন্যতম আকর্ষণ ছিল চড়ুইভাতি। আমাদের দেশের বাড়ি, দুর্গাপুরের কাছে গ্রামে। ছুটি পড়তেই মা তিন বোনকে নিয়ে সেখানে ঠাকুমার কাছে চলে যেতেন। আশপাশের আরও সব বাড়িতে খুড়তুতো, জাঠতুতো ভাই-বোনরা এসে জুটতো। সব মিলিয়ে বেশ বড় একটা দল। আমরা এদেশি গেরস্থ। তাই জমি-জমা তখনও কিছু ছিল। ভাগে ধান চাষ হত। আমাদের পারিবারিক কৃষক ছিলেন হরি পাল। আমরা বলতাম হরিদাদু। আমার দাদু যখন বেঁচে তখন তিনি প্রায়ই আসতেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। রোদ ঢালা বারান্দায় আরামকেদারায় দাদু বসে আছেন। পাশে একটি মোড়ায় হরিদাদু বসেছেন। দুজনের সুখ-দুঃখের গল্প হচ্ছে। ঠাকুমা চা-জলখাবার পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ঠাকুমার নির্দেশে প্রণাম করতাম হরিদাদুকে। মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতেন তিনি। হরিদাদুর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে দয়া পাল আমাদের দয়া কাকা চাষের ভার নিলেন। এই শীতের সময়টায় গ্রামের বাড়িতে থাকলে ভোর না হতেই রাস্তা থেকে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শোনা যেত। রাস্তা তখনও পাকা হয়নি। মাটির রাস্তায় ধানের বোঝা নিয়ে আসত গোরুর গাড়ি। সব বাড়িতেই ধান ঝাড়ার ব্যবস্থা হত। আমাদের খামারবাড়ি ছিল মূল বাড়ির ঠিক গায়ে। সেখানে বেশ খানিকটা জায়গার ঘাস চেঁছে পরিষ্কার করে মাটি লেপে রাখা হত। ধানের পাঁজা উঠতো তার পাশে। মাঠের ধান কেটে তোলা হয়ে যাওয়ার পর শুরু হত ঝাড়া। তখন ঠাকুমার সঙ্গে খাতা-পেন্সিল নিয়ে যেতে হত আমাকে। খামারের একপাশে ঠাকুমা বসতেন মোড়ায়। আর খড়ের গাদার ওপর আমি। পাটায় ধান ঝেড়ে আঁটি সরিয়ে রাখা হত। তারপর সেই ঝাড়া ধান ভাগ হত। ঠাকুমার নির্দেশ মেনে সেই হিসেব আমি লিখে রাখতাম খাতায়। খামারের পাশেই একটা মস্ত কুল গাছ ছিল। পাকা-পাকা টোপা কুলে ভর্তি। হিসেব লেখার ফাঁকে ঢিল ছুড়ে কুল পাড়া ছিল আমার বিনোদন। সারাদিন ধরে কুল খেয়ে আর খড়ের গাদায় গড়াগড়ি দিয়ে ঠাকুমার সঙ্গে বাড়ি ফিরতাম দুপুর গড়ালে। ধান ঝাড়া শেষ হলে খড়ের বিঁড়ে পাকিয়ে তার ভিতরে রাখার ব্যবস্থা হত। বিক্রি-বাট্টা করেও যা থাকত, তাতে বাড়ির সবার সারা বছরের খোরাকি হত অনায়াসেই। তখন সেই মিষ্টি লালচে চালের ভাত খাওয়াই ছিল অভ্যাস। পালিশ করা চকচকে চাল বাজারে আসেনি।

ধান তোলা হয়ে গেলে ওই খামার বাড়ির পাশেই ফলসা তলায় হত আমাদের পিকনিকের আয়োজন। মেনু একদম ফিক্সড। খিচুড়ি আর হাঁসের ডিমের ডালনা। আগের দিন রাতে চাঁদা তুলে পরদিন বাজারে যাওয়ার দায়িত্ব ছোটদের। তবে রান্না করত ঠাকুমার ম্যান ফ্রাইডে ভক্তিদা। কারণ ছোটদের আগুনের কাছে যাওয়া বারণ। কাঁচা শালপাতা দিয়ে বানানো থালায় হালকা হলুদ খিচুড়ি। তাতে ফুলকফি, আলু আর মটরশুঁটি। ডিম ভাঙলেই সকালের সূর্য়ের মত সোনালি কুসুম। খাওয়া যখন শেষ হত,তখন শেষ বিকেলের আলো কুলগাছের মাথায় চিকমিক করছে।

এ হল একেবারে স্কুলবেলার চড়ুইভাতি। পরে কলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও প্রতিবছর পিকনিক এক়টা হত। সেটা বেশ হাঁড়ি-কড়াই বেঁধে নিয়ে একটু দূরে কোথাও যাওয়া। তখনও কিন্তু রান্নার দায়িত্বটা নিজেদের। এব্যাপারে আমাদের নেতা ছিল মনোজদা। রান্না দাদা করত, আমরা সবাই জোগাড়ে। সে একটা সারাদিনের হৈহৈ করে হাসি-গল্পের আসর। সন্ধে নাগাদ লোক্যাল ট্রেনে চেপে গান গাইতে গাইতে ফেরা। আমাদের চাকরিজীবনের প্রথমদিকেও পিকনিক অনেকটা এরকমই ছিল। কিন্তু ধারণাটা বদলে গেল নব্বই-এর দশকের শেষদিক থেকে। আরও অনেক কিছুর মতই পিকনিকও একটু একটু করে কখন যেন কর্পোরাটাইজ হয়ে গেল। পিকনিক মানে এখন আর মাঠে-ময়দানে গর্ত খুঁড়ে উনুন জ্বালিয়ে রান্না নয়। সুসজ্জিত বাগানবাড়িতে সারাদিন কাটানো। খাবারের দায়িত্ব কেটারের। পানীয়ের আয়োজন সঙ্গে বিনোদনের জন্য ডিজেও নিশ্চিত। ফ্যামিলি পিকনিক হলে অবশ্য ছোটদের জন্য একটা ম্যাজিক দেখানোর ব্যবস্থাও থাকে। অর্থাত্ বনভোজন আর নয় এখন শুধুই ভোজন। পার্টির সঙ্গে পিকনিকের যে একটা উপাদানগত পার্থক্য আছে সেটা আজকের প্রজন্ম জানে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়।