
অবশেষ বঙ্গে শীত এসেছে। বাজারে সবজির রঙিন সমারোহ দেখে মনে পড়ল এই বিশেষ পদটি শীতকালেই বানাতেন আমার মা। ছোটবেলায় আমরা যেখানে থাকতাম সেই রাঢ়বঙ্গে শীতের সবজি উঠতে শুরু করত মোটামুটি পুজোর পর থেকেই। সেই সময় রাঁচির ওদিক থেকে আসত বড় বড় ধপধপে সাদা ফুলকফি, নরম কচি বীনস্, লম্বাটে মুক্তকেশী বেগুন, টুকটুকে লাল গাজর আর খানিকটা কমলাটে রঙের চ্যাপ্টা মত টোম্যাটো। এখন যেমন নিটোল লাল, পানসে স্বাদের হাইব্রিড টোম্যাটো বাজারে ওঠে, তখন সেরকমটা পাওয়া যেত না মোটেই। তবে সেই বোঁটাসুদ্ধ সবজিটির স্বাদ-গন্ধ দুই-ই ছিল চমৎকার। এবার শীত পড়ার শুরু থেকেই এসব তো খাওয়া হচ্ছে। তাই একটা সময় যখন একটু একঘেয়ে লাগতে শুরু করল তখন মা বানাতেন এই আচারি চচ্চড়ি। নামটা একেবারেই আমাদের দেওয়া। তার একটা কারণও অবশ্য আছে। রান্না যখন হত, তখন অনেকটা আচারের মতো একটা জিভে জল আনা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত আমাদের ছোট্ট কোয়ার্টারের বাতাসে। তখন বুঝতে পারতাম না, এখন জানি সেটা ছিল আসলে ফোড়নের গন্ধ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাড়িতে যা সবজি আছে, চাইলে সবই দিয়ে দেওয়া যেত এই রান্নায়। তবে স্বাদ একদম খোলতাই করার জন্য মা যেগুলি ব্যবহার করতেন সেগুলি হল ফুলকফি, বীনস্, বেগুন, গাজর আর মটরশুঁটি। আমি অনেকসময় একটু মোটা করে কাটা বাঁধাকপির পাতা, রাঙা আলু আর কচি মূলোও দিয়ে দেখেছি। দিব্যি লাগে। আসলে বাঙালির এই চচ্চড়ি পদটির বৈশিষ্টই এটা। রান্নাঘরের ঝুড়িতে ঝড়তি-পড়তি যা সবজি আছে, সেইসব কুড়িয়ে-বাড়িয়ে গিন্নি যখন জিভে জল আনা একটি পদ তৈরি করেন এবং তা দিয়ে একথালা ভাত শেষ করতে কারও কোনও অসুবিধা হয় না, তখনই তাকে বলে চচ্চড়ি। গরমের সবজি, শীতের সবজি সবদিয়েই তাই নানারকম চচ্চড়ি রাঁধার চল আমাদের দুই বাংলাতেই আছে। মজার ব্যাপার হল এটা এমন একটা ফেলা-ছড়ার রান্না যে কেউ কাউকে হাতে ধরে শেখায় না। কিন্তু গিন্নিপনা করতে করতে সবাই কেমন যেন আপনিই শিখে যায়। যেমন মা শিখেছে দিদার কাছ থেকে, আমি মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ মনে করে। তবে এই আচারি চচ্চড়ি কিন্তু সাধারণ পাঁচমেশালি চচ্চড়ির থেকে একটু আলাদা। কারণ এর স্বাদে বাংলা-বিহারের একটা মেলবন্ধন আছে। আমার মামাবাড়ি ধানবাদে। আগে ছিল বিহার, এখন ঝাড়খণ্ড। বড় হয়েছি আসানসোলে, সেও একেবারে বাংলা-বিহারের সীমানায়। তাই আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাসে পাশের রাজ্যের একটা প্রভাব রয়েছে, আচারি চচ্চড়িও তার ব্যতিক্রম নয়।
মা যেভাবে রাঁধতেন সেটাই বলি। ফুলকফি, কচি বীনস্, বেগুন, আর গাজর প্রথমে লম্বা করে কেটে নিতে হবে। মটরশুঁটি ছাড়ানো আলাদা থাকল। মাঝ শীতের ফুলকফি। তাই একটু ভাপিয়ে নেওয়াই ভাল। অল্প সর্ষে বেটে নিতে হবে। বেশ অনেকটা টোম্যাটো থেঁতো করে আর রসুন কুচি করে রাখতে হবে। এবার সবজিগুলো নুন, হলুদ, সর্ষেবাটা, অল্প চিনি আর কাঁচা তেল দিয়ে ভালো করে মেখে মিনিট পাঁচেক মজতে দিতে হবে। তারপর কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা দিলেই একটা বেশ মন মাতানো গন্ধ আসবে। তখন তাতে বেশ খানিকটা রসুন কুচি দিয়ে ভালো করে নাড়াচাড়া করে থেঁতো করে রাখা টোম্যাটো দিলেই জল বেরোবে হুড়মুড়িয়ে। সেই জলে এবার পড়বে আগে থেকে মেখে রাখা সবজি। উল্টেপাল্টে নেড়ে, ঢাকা দিয়ে একদম ঢিমে আঁচে বসিয়ে রাখতে হবে কিছুক্ষণ। সবজি থেকেও জল বেরোবে। তাই আলাদা জল দেওয়ার দরকার নেই। টোম্যাটোর পরিমাণ বেশি থাকায় একটু টক স্বাদ হবে। সেটি বেশি মনে হলে সামান্য চিনি দিয়ে ব্যালান্স করা যেতে পারে। রান্না হওয়ার সময়েই পাঁচফোড়ন, রসুন আর টোম্যাটোর মিশেলে একটা চমৎকার জিভে জল আনা আচারের গন্ধ ছড়াবে বাতাসে। আচারি চচ্চড়ি একটু শুকনো শুকনো হয়। রুটি-পরোটার সঙ্গেই বেশি ভালো লাগে। শীতের রাতে, উনুনের ধার ঘেঁষে বসে, গরম রুটির সঙ্গে এই চচ্চড়ি সেই মেয়েবেলায় ছিল আমাদের রীতিমতো ডেলিকেসি।