নব্বই বছরের জন্মদিনের উৎসবে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর সঙ্গে আমার পরিচয় কিংবা বলা ভালো প্রথম দেখা হয়েছিল যখন, তখন আমি নেহাতই ছোট। স্কুলে পড়ি। তাও খুব উঁচু ক্লাসে নয়। অজিতেশ বাবার বন্ধু ছিলেন। সেই সুবাদে কোনও একটা নাটকের শেষে গ্রিনরুমে বসে বাবা এবং অজিত জেঠুর অন্য বন্ধুরা যখন গল্প করছেন, তখনই দেখেছিলাম রুদ্রপ্রসাদকেও। খুব যে নজর করেছিলাম তেমনটা নয়। তারপর নান্দীকার ভেঙে গেল। অজিতেশ আলাদা দল করলেন। অজিতেশ এবং রুদ্রপ্রসাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হল। কিন্তু বাবা আদতে অজিতেশের বন্ধু হলেও রুদ্রবাবুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। দল ভেঙে যাওয়ার পরও নান্দীকারের নাটক এলে বাবা দেখতে যেতেন। আমিও কয়েকবার গেছি এবং বাবা যখন রুদ্রবাবুর সঙ্গে কথা বলছেন, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। আমার কলকাতায় পড়তে আসার বয়স হওয়ার আগেই অজিতেশ মারা গেলেন। যাদবপুরে পড়াকালীন নান্দীকারের নাটক দেখলেও রুদ্রবাবুর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ আমার হয়নি। তবে নাটকে আগ্রহ ছিল বলে মানুষটির সম্বন্ধে অনেক কথা জানতে পেরেছিলাম, তাঁর অভিনয় দেখেও মুগ্ধ হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর ঢুকলাম সাংবাদিকের চাকরিতে। বেশ কয়েকবছর পর, তখন আমি সাংবাদিক হিসাবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত কোনও একটা কারণে প্রয়োজন হল রুদ্রপ্রসাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার। অফিস থেকে বেরোনর সময় বস্ আমাকে বললেন,

ভদ্রলোক কিন্তু অসম্ভব বদমেজাজি আর দুর্মুখ। ইন্টারভিউটা দরকার। পারবে তো নিতে ?

আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম,

চিন্তা করবেন না। আমার অসুবিধা হবে না। উনি আমার বাবার বন্ধু।

দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে খুব কমই হয়েছে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। সেদিনও প্রায় তাই হয়েছিল। প্রায় বললাম, এই কারণে যে তিনি প্রথম প্রশ্নটার উত্তর দিয়েছিলেন। তারপরে আমি আরও বিস্তারিতভাবে জানতে এবং এক্সক্লুসিভ খবর করার বাসনায় বাবার নামটি উল্লেখ করেছিলাম। ব্যাস্, তাতেই হয়ে গেল সর্বনাশ। এক্সক্লুসিভ দূরস্থান, তারপর আর কোনও প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। মহড়া শুরু হয়ে গেছে বলে একরকম ঘাড় ধরেই বার করে দিলেন।

এই ঘটনা কিন্তু একবার ঘটল না। পেশাদারি প্রয়োজনে তারপরেও বেশ কয়েকবার আমাকে তাঁর কাছে যেতে হয়েছে। বুঝতে পেরেছি যে তিনি আমাকে মনে রেখেছেন এবং আমি যাতে কোনওভাবে নৈকট্যস্থাপনের চেষ্টা করতে না পারি সেজন্য সতর্ক থাকেন। কেন তিনি এটা করেন তার কারণ আমি বুঝতে পারতাম না। তবে তাঁর মনোভাব বুঝে আমিও কোনওরকম ব্যক্তিগত বাক্যালাপের মধ্যে যেতাম না। যদিও এটা বুঝেছিলাম, তিনি যে শুধু আমার সঙ্গে রুঢ় ব্যবহার করেন এমনটা নয়। সাধারণভাবে সাংবাদিককুলের প্রতিই তাঁর আচরণ এরকমই। সাংবাদিকরা কোনও বিষয় খুব গভীরভাবে জানে বলে তিনি মনে করেন না, বিশেষ করে নাটক তো নয়ই। কিন্তু নতুন নাটক করলে তার একটা প্রচার তো দরকার হয়। তাই সাংবাদিকদের একেবারে বাদ দিলে চলে না।

বাবার সঙ্গে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত

চলছিল এরকমভাবেই। ইতিমধ্যে আমার বৈদ্যুতিন মাধ্যমে বেশ কয়েকবছর কাজ করা হয়ে গেছে। বিনোদনমূলক এবং সাংস্কৃতিক জগতের খবরাখবর করে খানিকটা পরিচিতিও বেড়েছে। এইসময় একদিন খবর পাওয়া গেল নান্দীকার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাপ্পাদিত্য মঞ্চস্থ করবে। মূল চরিত্রে সোহিনী। খবর পেয়ে আমি একদিন মহড়ার সময় গিয়ে হাজির হলাম। রিহার্সাল চলছিল ফেডারেশন হলের চারতলায়। সবাই গোল করে বসে রয়েছে। রুদ্রবাবুও সেখানে রয়েছেন। আমিও গিয়ে সেখানেই বসলাম। মাঝখানে সোহিনী অভিনয় করছে। মহড়া হয়ে গেলে তারপর কথা-বার্তা বলার সুযোগ আসবে। আমি যখন গেছিলাম, তখন নাটক তৈরি হয়ে গেছে। তার দু-একদিন পরেই মঞ্চস্থ হওয়ার কথা। তাই টানা রিহার্সাল হচ্ছিল। সেইসময় বাপ্পাদিত্য গল্প থেকে একটি অংশ বলতে বলতে সোহিনী হঠাৎ পার্ট ভুলে গেল। যেহেতু ততদিনে সবাই তৈরি হয়ে গেছে, তাই সম্ভবত প্রম্পট করার জন্য কেউ ছিলেন না। সোহিনী কেমন যেন একটু থতমত খেয়ে চুপ করে গেছে। আর কেউ কিছু বলছে না। এদিকে আমার ছোটবেলা থেকে বহুবার পড়ে বাপ্পাদিত্য প্রায় কণ্ঠস্থ। তাই খানিকটা বলা যেতে পারে প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই আমি পরের দুটো লাইন বলে দিলাম আর সোহিনীও সেখান থেকে ধরে নিয়ে আবার অভিনয়ে ফিরল। কাজটা করে ফেলে আমি অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম এবং লক্ষ্য করলাম রুদ্রবাবু আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা যে আরও একটু খারাপ হল সেটাও বুঝে নিতে অসুবিধা হল না। কিন্তু কিছু করার নেই। বসে আছি চুপচাপ। একসময় মহড়া শেষ হল। সোহিনীর সঙ্গে কিছু কথা বলে কেটে পড়ব ঠিক করেছি এমন সময় রুদ্রবাবু নিজেই হাত নেড়ে ডাকলেন। ভয়ে ভয়ে কাছে গেলাম। বাপ্পাদিত্য নাটকটা তাঁরা কেন বেছেছেন, কী তার আঙ্গিক, কী ধরেন মিউজিক এবং কস্টিউম ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে মঞ্চ সাজানো হবে বললেন বিস্তারিতভাবে। আমি তো রীতিমত হতবাক্। ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর যখন উঠে চলে আসছি, তখন হঠাৎ পিছন থেকে ডেকে বললেন,

তোর বাপ কেমন আছে ? তাকে বলিস আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে.....

বোকার মতো ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম। প্রথমটায় কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেছিলাম। কিন্তু মাথা একটু ঠাণ্ডা হলে বুঝলাম এর আগে বাবার পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম বলে উনি আমাকে স্বীকার করেননি। আজকের ঘটনায় আমার নিজের যোগ্যতার কিছু প্রমাণ ওঁর চোখে পড়েছে। তারই স্বীকৃতি দিলেন এভাবে। প্রকৃত অভিভাবক বোধহয় এরকমই হন। তারপর আমি বহুবার ওঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। নান্দীকার নাট্যোৎসবের এক্সক্লুসিভ খবর করেছি। এবছর নবতীপর হলেন তিনি। জন্মদিনে গিয়ে প্রণাম করলাম যখন দুহাত মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন। বাবাও এবার নব্বই। বাবার জন্মদিনের সকালেও ফোন করতে ভোলেননি।